চিরন্তন প্রতীক্ষা
শহরের ব্যস্ত জীবনের মধ্যে তমাল আর অনন্যার প্রেম যেন এক টুকরো শান্তি। তাদের ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ, গভীর, আর একেবারে পরিপূর্ণ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা শহরের এক নির্জন পার্কে দেখা করত। পার্কের এক কোণে ছিল একটি পুরোনো, বিশাল বটগাছ। গাছটির নিচে বসে তারা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করত, হাসত, কাঁদত, এবং প্রতিজ্ঞা করত, তারা একে অপরকে কোনো দিন ছেড়ে যাবে না।
কিন্তু হঠাৎ করেই সব বদলে গেল। একদিন সন্ধ্যায় অনন্যা পার্কে এল না। তমাল সারা রাত অপেক্ষা করল। ভোর হয়ে এলো, কিন্তু অনন্যা এল না। ফোন করলেও কেউ উত্তর দিচ্ছিল না। সে পরে জানতে পারল, একটি ভয়ানক দুর্ঘটনায় অনন্যার মৃত্যু হয়েছে। তমাল যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল।
এরপর থেকে তমাল প্রতিদিন সেই পার্কে যায়। বটগাছের নিচে বসে সে একাই অনন্যার সঙ্গে কথা বলে। তার বন্ধুরা অনেকবার বলেছে, "তমাল, অনন্যা আর ফিরে আসবে না। নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করো।" কিন্তু তমাল কখনো কাউকে শোনেনি।
একদিন রাতে তমাল যখন বটগাছের নিচে বসেছিল, তখন হঠাৎই বাতাস ভারী হয়ে উঠল। চারপাশে কেমন একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক তখনই সে শুনতে পেল পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর, "তমাল, আমি এখানে।"
তমাল চমকে উঠে চারদিকে তাকাল। বটগাছের নিচে মৃদু আলোয় অনন্যার অবয়ব দেখা গেল। সাদা পোশাকে, তার প্রিয় হাসি নিয়ে অনন্যা তার দিকে এগিয়ে এলো।
তমাল প্রথমে ভয়ে জমে গিয়েছিল, কিন্তু তারপর সে অনুভব করল, এটা তার ভালোবাসার অনন্যা। অনন্যা বলল, "তমাল, আমি আসতে দেরি করে ফেলেছি। কিন্তু আমি প্রতিদিন এখানে এসেছি, তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।"
তমাল কাঁদতে কাঁদতে বলল, "তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে কেন? আমি তো তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারি না।"
অনন্যা মৃদু হেসে বলল, "আমি তোমার কাছেই ছিলাম। কিন্তু আমরা আর এক হতে পারি না। তুমি জীবিত, আর আমি..."
তমাল হঠাৎ অনুভব করল, তার শরীর ভারী হয়ে আসছে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। অনন্যা তার হাত ধরল। বলল, "তোমার সময় হয়নি। কিন্তু যখন সময় হবে, আমি এখানে তোমার অপেক্ষায় থাকব।"
এই বলে অনন্যা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
এরপর থেকে তমাল আর কখনো বটগাছের নিচে যায়নি। তবে সে জানে, যখন তার সময় হবে, তার ভালোবাসা তাকে খুঁজে নেবে। কারণ ভালোবাসা কখনো মরে না।