রাতের আতঙ্ক
রাতের আধার যেন প্রতি দিন গভীর থেকে গভীরতর হয়। প্রতিটি রাত মনে হয় এক নতুন চ্যালেঞ্জ। রিমনের বয়স মাত্র পঁচিশ। সবে চাকরিতে যোগ দিয়েছে। শহরের ব্যস্ত জীবনের মাঝে একা এক ঘরে থাকার মজাই আলাদা। তবে রিমনের কাছে এটা মজা নয়, ভয়ঙ্কর এক অভিশাপ।
প্রতি রাতেই সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। যখন ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়ে, ঠিক তখনই তার শরীর ঝিম ধরে যায়। যেন কেউ তার শরীরের সব শক্তি শুষে নিচ্ছে। প্রথমদিকে ভেবেছিল এটা হয়তো তার কাজের চাপের কারণে হচ্ছে। কিন্তু এক রাতে ঘটে যায় এক ভয়ানক ঘটনা।
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। ঘরের সমস্ত আলো বন্ধ। বাইরে থেকে আসা হালকা হাওয়ার শব্দ ঘরে এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল। রিমন তখন ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই সে অনুভব করল, তার শরীর যেন কোনো শক্তিশালী কিছু দ্বারা চেপে ধরা হচ্ছে। তার হাত-পা নড়ছে না। যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে চেপে ধরে আছে।
তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সে চিৎকার করতে চাইছিল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, ঘরের ছায়ার মাঝে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারের গভীরে দুটি লালচে চোখ যেন তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
এই ঘটনার পরদিন সকালে রিমন অফিসে গিয়ে সহকর্মী শাহিনকে বলল সবকিছু। শাহিন হেসে বলল, "আরে ভাই, এটা তো স্লিপ প্যারালাইসিস। আমি নিজেও একবার এমন কিছু অনুভব করেছি। কিছুদিন পরে ঠিক হয়ে যাবে।"
কিন্তু রিমনের জন্য ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়নি। পরের কয়েক রাত আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এক রাতে সে ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়ার পর আবার সেই অনুভূতি হলো। তবে এবার আর শুধু চেপে ধরা নয়। সে স্পষ্ট শুনতে পেল একটি ফিসফিসে কণ্ঠস্বর, "আলো বন্ধ করেছিস কেন?"
রিমন আতঙ্কে প্রায় হৃদস্পন্দন বন্ধ করে ফেলতে যাচ্ছিল। সে কোনো মতে নিজেকে সামলে রাখল। আলো জ্বালাতে চেয়েছিল, কিন্তু শরীর একেবারে পাথরের মতো অচল। চোখের কোণে দেখতে পেল, সেই ছায়া এবার তার বিছানার পাশে। একটা হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরদিন রিমন ঠিক করল, কোনো উপায়েই হোক এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। সে তার ফ্ল্যাটের মালিকের কাছে গিয়ে জানতে চাইল, এই ঘরটা নিয়ে আগে কেউ কোনো অভিযোগ করেছে কিনা। মালিক প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। কিন্তু রিমনের চাপাচাপিতে বলল, "এই ঘরে এক যুবক এক সময় থাকত। সে একদিন ঘরের লাইট বন্ধ করে ঘুমানোর সময় মারা যায়। সবাই বলেছিল, সে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। কিন্তু প্রতিবেশীরা বলে, তার শরীরে নাকি ভয়ানক ক্ষতচিহ্ন ছিল।"
রিমনের মনে ভয় আরও বাড়ল। সে একজন স্থানীয় তান্ত্রিকের শরণাপন্ন হলো। তান্ত্রিক তাকে বলল, "ঘরের আলো কখনো বন্ধ করবি না। তোর সঙ্গে যা হচ্ছে, সেটা একটা আত্মার কাজ। সে অন্ধকারে নিজের শক্তি বাড়ায়।"
সেই রাতে রিমন ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে অদ্ভুত এক শীতল অনুভূতি তার শরীরকে গ্রাস করতে লাগল। সে বুঝতে পারল, আলো জ্বালিয়ে রাখলেও সেটা তাকে বাঁচাতে পারবে না। সেই ছায়া এবার ঘরের কোণে স্পষ্ট আকারে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখে এক বিভীষিকাময় হাসি।
ছায়াটা এবার রিমনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। রিমন নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু সব বৃথা। ছায়াটা তার ওপর চেপে বসল। রিমনের শ্বাস বন্ধ হতে শুরু করল।
হঠাৎই বাইরে থেকে ভোরের আলো ঘরের জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। ছায়াটা চিৎকার করে উঠে মিলিয়ে গেল। রিমন যেন নতুন জীবন ফিরে পেল।
পরদিন সকালে রিমন তার চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়ি ফিরে গেল। তার ধারণা, শহরের সেই ফ্ল্যাট আর তাকে বাঁচতে দেবে না। কিন্তু সে জানে না, সেই ছায়া তার সঙ্গেই চলে এসেছে। কারণ রাতে ঘুমানোর সময় সে আবার সেই ফিসফিসে কণ্ঠ শুনল, "তুই আলো জ্বালিয়ে কোথায় পালাবি?"