অরুণি ভবনের অভিশাপ ( ভৌতিক ছোট গল্প)

 

অরুণি ভবনের অভিশাপ

শহরের এক প্রান্তে প্রায় এক শতাব্দী পুরনো একটি বাড়ি আছে, নাম অরুণি ভবন। এটি একসময় এক ধনী জমিদারের বাসভবন ছিল। জমিদারের মৃত্যু ও তার পরিবারের রহস্যময় অন্তর্ধানের পর বাড়িটি ফাঁকা পড়ে থাকে। কেউ সেখানে বেশিদিন থাকতে পারেনি। স্থানীয়রা বলে, রাতের বেলায় বাড়িটিতে অদ্ভুত কান্না আর চিৎকার শোনা যায়।

রোহান, একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, এই বাড়ি নিয়ে একটি আর্টিকেল লেখার দায়িত্ব নেয়। সে ভূতপ্রেত বিশ্বাস করে না। বাড়ির অন্ধকার কাহিনি তাকে বেশি আকর্ষণ করে। অনেক নিষেধ সত্ত্বেও সে অরুণি ভবনে এক রাত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।

রাতের অভিযান

রোহান সন্ধ্যায় টর্চ, ক্যামেরা, আর নোটবুক নিয়ে বাড়িতে পৌঁছায়। দরজার লোহার কপাটগুলো জং ধরা। ভেতরে ঢুকতেই ঠাণ্ডা একটা হাওয়ার ঝাপটা তার মুখে লাগে। বাড়ির ভেতর বেশ বড়, তবে ধুলো আর জালের জন্য সবকিছু ফিকে। চারপাশে এক ধরনের পচা গন্ধ।

প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক লাগল না। রোহান বিভিন্ন ঘরের ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘরের দেয়ালে কিছু পুরনো ছবি ঝুলছে—একটি জমিদার পরিবারের। কিন্তু তাদের সবার চোখের দৃষ্টি যেন তাকে অনুসরণ করছে। একসময় রোহান বাড়ির একটা বড় কক্ষের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা বন্ধ, কিন্তু ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

সে দরজা ঠেলে খুলতেই দেখতে পেল, ঘরটা প্রায় ফাঁকা। কিন্তু মেঝেতে তাজা রক্তের দাগ। রক্তগুলো একটা পথ তৈরি করে ভেতরের আরেকটা ছোট দরজার দিকে নিয়ে গেছে। ভয় পেলেও কৌতূহল দমন করতে পারল না রোহান।

অতীতের ছায়া

রোহান দরজাটা খুলতেই দেখতে পেল একটা সরু সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে নেমে সে বাড়ির গোপন একটি ঘরে পৌঁছাল। সেখানে একটা বিশাল আয়না রাখা। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই তার শরীর কেমন যেন ভারী হয়ে গেল। আয়নার মধ্যে নিজেকে দেখতে পেল সে। কিন্তু হঠাৎ করেই নিজের প্রতিবিম্ব বদলে গেল।

প্রতিবিম্বে দেখা গেল, রোহান জমিদারের পোশাক পরে আছে। পেছনে একটা মহিলা, যার মুখ রক্তাক্ত আর চোখে ভয়ঙ্কর ক্রোধ। মহিলা চিৎকার করে বলল, "আমার সন্তানদের ফেরত দাও!"

রোহান চমকে সরে গেল। আয়নার সামনে কিছু লেখা ফুটে উঠল, "রক্তের ঋণ শুধরে দাও।" এর মানে কী, সে বুঝে উঠতে পারল না।

আত্মার প্রতিশোধ

হঠাৎ তার চারপাশের পরিবেশ বদলে গেল। সে নিজেকে সেই পরিবারের মধ্যে দেখতে পেল। জমিদার তার স্ত্রী আর সন্তানদের ওপর অকথ্য নির্যাতন করছিল। স্ত্রী প্রতিশোধ নিতে সন্তানদের নিয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তার অভিশাপ ছিল—জমিদারের আত্মা আর তার পরিবার চিরদিন এই বাড়িতে আটকে থাকবে।

রোহান বুঝতে পারল, সে এই অভিশাপের এক অংশ হয়ে গেছে। তার শরীর ভারী হতে লাগল। কান্না, চিৎকার আর বিকৃত হাসির শব্দে ঘরটা ভরে গেল।

শেষ পরিণতি

পরদিন সকালে পুলিশ রোহানকে খুঁজতে এসে দেখে, অরুণি ভবনের ভেতর তার জিনিসপত্র এলোমেলো পড়ে আছে। কিন্তু রোহানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বাড়ির সেই আয়নায় এখনো মাঝে মাঝে রোহানের মুখ দেখা যায়। সে সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে ডাকছে। কিন্তু কেউ সাহস করে আর সেই বাড়ির কাছে যায় না।

কথিত আছে, অরুণি ভবন যেই একবার ঢুকে, সে আর কখনো ফিরে আসে না। তবে রাত গভীর হলে, বাড়ির ভেতর থেকে শোনা যায় কান্নার শব্দ আর এক বিকট পুরুষের হাসি।

Post a Comment

Previous Post Next Post